বাংলাদেশ ক্রিকেটের কোনো অনুরাগীই ২০১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপ ভুলে যেতে পারবেন না—সেই আসর যেন ছিল সাকিব আল হাসানের জাদুকরী প্রদর্শনীর মঞ্চ। ব্যাট হাতে রানের বন্যা, বল হাতে নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ, ফিল্ডিংয়ে অপরিসীম দক্ষতা—সব মিলিয়ে ক্রিকেটবিশ্বকে মুগ্ধ করেছিলেন তিনি।
সম্প্রতি বিয়ার্ড বিফোর উইকেট পডকাস্টে নিজের ক্যারিয়ারের সেরা স্মৃতি, বিশ্বকাপ প্রস্তুতি এবং তখনকার বাংলাদেশ দলের শক্তিমত্তা নিয়ে দীর্ঘ আলাপ করেছেন সাকিব। সেখানে উপস্থিত ছিলেন ইংল্যান্ডের অলরাউন্ডার মঈন আলীও।
‘২০১৯ বিশ্বকাপই আমার সেরা ক্রিকেটীয় স্মৃতি’
সাকিব জানালেন, ক্রিকেট জীবনে অসংখ্য স্মৃতি থাকলেও ২০১৯ বিশ্বকাপের সময়টাই তাঁর কাছে সবচেয়ে উজ্জ্বল। একইসঙ্গে স্মরণ করেন প্রথমবার অনূর্ধ্ব–১৫ দলে ডাক পাওয়ার আবেগঘন মুহূর্তটিও।
মঈন–সাকিবের মজার কথোপকথন
আলাপচারিতায় উঠে আসে ২০১৫ বিশ্বকাপে মঈন আলীর বলে সাকিবের আউট হওয়ার কথাও।
মঈন মজা করে বলেন, “ভালো বলেই তাকে আউট করেছিলাম।”
হাসতে হাসতেই সাকিবের জবাব, “সে তো আমাকে বহুবার আউট করেছে।”
তবে সাকিব মনে করিয়ে দেন, সেই ম্যাচের হারই ইংল্যান্ডকে বদলে দিয়েছিল। মঈনও এ কথা স্বীকার করে জানান—হারের পর ইংলিশ ক্রিকেট নতুন ভাবনায় পথ খুঁজেছিল।
১৫ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে হারানো—ইতিহাসের বড় অধ্যায়
সেই স্মৃতি টানতেই সাকিব বলেন, ২০১৫ সালে ইংল্যান্ডকে হারানো বাংলাদেশ ক্রিকেটের শীর্ষ তিন ঘটনার একটি। প্রথমবার কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা, দল ও সমর্থকদের সমান উৎসাহ—সব মিলিয়ে এটি ছিল যুগান্তকারী মুহূর্ত।
২০১৫–১৯: বাংলাদেশের সাদা বলের সবচেয়ে উজ্জ্বল সময়
সাকিব মনে করেন, ওই চার-পাঁচ বছরই ছিল বাংলাদেশ ওয়ানডে দলের সেরা সময়।
মুশফিক, রিয়াদ, তামিম, সাকিব—একসাথে দীর্ঘ সময় খেলার অভিজ্ঞতা দলকে শক্তিশালী করেছিল। ২০১৭ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনাল, ২০১৫ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল—সবই সেই ধারাবাহিকতার ফল।
পাশ থেকে মঈন যোগ করেন, বাংলাদেশের তখনকার দল ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী—মাহমুদউল্লাহ, মাশরাফি, ইমরুল, মিরাজ—সব মিলিয়ে ৫০ ওভারের ক্রিকেটে উল্লেখযোগ্য শক্তির দল। তবে তাঁর মতে, টি-টোয়েন্টিতে একজন পাওয়ারহিটার যোগ হলে দল আরও ভয়ংকর হবে। সাকিবও এই মতের সঙ্গে একমত।
আইপিএলের হতাশা থেকে বিশ্বকাপ-জয়ের মানসিক প্রস্তুতি
২০১৯ বিশ্বকাপের আগের মৌসুমে হায়দরাবাদের হয়ে খুব একটা সুযোগ পাচ্ছিলেন না সাকিব। তখনই তিনি নিজের সঙ্গে কঠোর আলাপ করেন—
“যা অর্জন করতে চাই, তার জন্য যথেষ্ট পরিশ্রম করিনি।”
এর পর শুরু করেন কঠিন ট্রেনিং। প্রতিদিন তিনবার নেট, দুই সেশন জিম—এভাবে টানা ১৫ দিন। ওজন কমে যায়, সতীর্থরাও অবাক হন। টম মুডিকে সোজাসাপটা বলেন—বিশ্বকাপে সব উত্তর মিলবে।
আয়ারল্যান্ড সফরে দারুণ ফর্মে থাকলেও ফাইনালের আগে ইনজুরিতে পড়ায় সে সুযোগ ছাড়েন তিনি। কারণ সামনে ছিল তাঁর স্বপ্নের বিশ্বকাপ।
বিশ্বকাপে একের পর এক উজ্জ্বলতা
দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৭৫, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে অর্ধশতক—এভাবে এগিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জফরা আর্চারের ১৫০+ গতির বলে দৃঢ়তা এবং লম্বা ছয়ের পর সাকিব বুঝে যান—
“হ্যাঁ, আমি প্রস্তুত। আমি পারব।”
উদযাপনহীন সেঞ্চুরির কারণ
সাকিব জানান, বিশ্বকাপের আগে একটি ছোট কাগজে নিজের জন্য শক্ত প্রতিজ্ঞা লিখে রেখেছিলেন—
‘প্রতিটি বল খেলব দেশের জন্য, নিজের জন্য নয়।’
সেজন্যই সেঞ্চুরি করেও বাড়তি উদযাপন করেননি।
মঈন প্রশংসায় বলেন—এমন অলরাউন্ড পারফরম্যান্স বিশ্বকাপে খুব কমই দেখা গেছে। সাকিব ইউভারাজের ২০১১ বিশ্বকাপ স্মরণ করালেও মঈনের মতে, ব্যাট–বলে এমন আধিপত্য আর কেউ দেখাননি।
হায়দরাবাদের নেটে সাকিবের আলাদা প্রস্তুতি
আইপিএলের সময় বাংলাদেশের কোচ সালাউদ্দিনকে বিশেষভাবে হায়দরাবাদে উড়িয়ে এনেছিলেন সাকিব। দলের ট্রেনিং বাদেও আলাদা করে প্রতিদিন অতিরিক্ত দুই সেশন অনুশীলন করেছেন। রশিদ খান, উইলিয়ামসন, ম্যাককালাম—সবাইকে কাছ থেকে দেখে শেখার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি।
বাংলাদেশ দলে নেতৃত্বের কথাবার্তা কম হওয়াকেই বড় ঘাটতি মনে করেন সাকিব। তাঁর মতে, বিদেশি লিগগুলোতে ক্রিকেটারদের মধ্যে আলোচনাই বড় শক্তি।
বিশ্বকাপের অমর নায়ক
৬০৬ রান ও ১১ উইকেটে ২০১৯ বিশ্বকাপ সাকিবের ক্যারিয়ার নয়, বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসেও স্থায়ী হয়ে গেছে।
বর্তমানে সাকিব রয়েছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতে, আইএলটি–২০ লিগে এমআই এমিরেটসের হয়ে খেলছেন।